মুসলিম বিবাহ একটি চুক্তি, যা মুসলিম আইন অনুসারে পরিচালিত হয়। এই চুক্তির অথাৎ বিয়ে হওয়ার সময় কিছু শর্তাবলি ঠিকঠাক করে নেওয়া প্রয়োজন। যাতে পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।
মুসলিম আইন কোরআনের আলোকে পরিচালিত হয়। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিবাহ, তালাক, ভরণপোষণ, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়ে বিধান দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে অসন্তোষ প্রকাশ পেলে যে কেউ বিবাহ–বিচ্ছেদের দিকে যেতে পারেন।
তালাক অর্থ বিবাহ ভঙ্গ বা বাতিল করা। আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদকে তালাক বলা হয়। তালাক শব্দের আভিধানিক অর্থ বন্ধনমুক্ত করা। তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। অনেকসময় উভয়পক্ষ একমত হয়ে শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীন তালাক দিতে প্রস্তুত হয়। এ তালাককে বলা হয় খুলা তালাক।
বিবাহ একটি সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথা। পৃথিবীর সব ধর্মেই বিবাহ আছে। তবে বিবাহ বিচ্ছেদ সব ধর্মে নেই। বিবাহ স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ ভঙ্গ করতে পারেন। তবে কাবিননামায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের অধিকার না দিলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যম ছাড়া তালাক দিতে পারেন না। তবে এখন কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়ে থাকে। এটা প্রেসিডেন্ট অর্ডারের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে তালাকের আগেই স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করার নিয়ম। যদিও অনেকেই তা মানেন না। দেনমোহর বিয়ের শর্ত, তালাকের নয়।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে বিবাহ বা তালাক রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামুলক ছিল না। ১৯৬১ সালের আইনে বিবাহ ও তালাক রেজিষ্ট্রেশন বাধ্যতামুলক করা হয়। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ ও ৮ ধারায় বিবাহ ভঙ্গ বা তালাকের বিষয়ে বলা হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে তালাকের প্রক্রিয়া সম্পর্কে। ৭ ধারা অনুযায়ী তালাক প্রদানের জন্য স্বামী বা স্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে নোটিশ লিখিতভাবে পাঠাবে হবে।
আইনুন নাহার সিদ্দিকা
চেয়ারম্যান একটি সালিসি পরিষদ গঠন করে উভয়পক্ষকে জানাবেন। সালিশ পরিষদের চেষ্টা হবে তালাকটা যেন না হয়। তারপরও যদি কোনো পক্ষ তালাক দিতেই চায়, তবে নোটিশ দেওয়ার ৯০ দিন পর তালাক রেজিষ্ট্রেশন করতে হবে। তালাক রেজিষ্ট্রেশনও নিকাহ্ রেজিষ্টারই করবে। তালাকের ক্ষেত্রে আইনে প্রদত্ত নিয়ম পালন না করলে বা চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রদানে ব্যর্থ হলে কারাদন্ড এবং জরিমানা হবে।
যদি কোনো নারী অন্তঃসত্ত্বা থাকেন এবং ওই সময় তাকে তালাক দেওয়া হয়, তবে সে তালাক কার্যকর হয় না। কারণ গর্ভকালীন সময়টাই হয় ইদ্দতকালীন সময়। তাই গর্ভাবস্থায় তালাক কার্যকর হয় না।
১৯৮৫ সনের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে গঠিত পারিবারিক আদালত বিবাহ ভঙ্গের ডিক্রি প্রদান করতে পারেন। পারিবারিক আদালতের ডিক্রি দ্বারা যে বিবাহ ভঙ্গ হয়েছে, ডিক্রি প্রদানের ৭ দিনের মধ্যে আদালত ডিক্রির সত্যায়িত সব নিবন্ধিত ডাকযোগে উপযুক্ত চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবেন। ডিক্রির কপি পেয়ে চেয়ারম্যান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
লেখক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট